ডায়াবেটিস আসলে কি- ডায়াবেটিসের লক্ষণ কি কি
প্রিয় বন্ধুরা, আজকের দিনে এসে কারোর বাসায় ডায়াবেটিসের রোগী নেই এমন উদাহরণ মেলা ভার। কারোর কারোর বাবা-মা, কারোর আবার দাদা দাদি অথবা নানা নানীর মধ্যে এই পরিচিত সমস্যাটি বিদ্যমান। তোমরা হয়তো হয়তো প্রায়ই সময় দেখে থাকবে, দাদু অথবা নানুর ডায়াবেটিস, ডাক্তার করা ভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন তিনি জাতীয় কোন দ্রব্য বা মিষ্টি না খাওয়ার জন্য কিন্তু মাঝরাতে উঠে লুকিয়ে লুকিয়ে ওনারায় ফ্রিজ থেকে বের করে মিষ্টি খান।
আচ্ছা, তোমরা কি জানো, ডাইবেটিস আসলে কি? কেন এটা হয়? ডায়াবেটিস হলে কেনই বা মিষ্টি খাওয়ার প্রতি কড়া নিষেধ থাকে? ডায়াবেটিস রোগীর ব্যায়াম ,ডায়াবেটিস মাপার মেশিনের দাম কত চলো,আজ সহজে আমরা ডায়াবেটিস সম্পর্কে কিছু জানি।
পোস্ট সূচিপত্রঃডায়াবেটিস আসলে কি-ডায়াবেটিসের লক্ষণ কি কি।
- ডায়াবেটিস আসলে কি
- দুই প্রকার ডায়াবেটিস
- ডায়াবেটিসের লক্ষণ কি কি
- ডায়াবেটিস রোগীর ব্যায়াম
- ডায়াবেটিস মাপার মেশিনের দাম কত
- ডায়াবেটিস হলে কি কি খাবার খাওয়া উচিত
- ডায়াবেটিস থেকে কি সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া সম্ভব
- শেষ কথা
ডায়াবেটিস আসলে কি
আমাদের শরীরে রক্ত আছে সেই কথা তোমরা সবাই জানো। এই রক্তের অন্যতম একটা কাজ হল,
আমরা যেসব খাবার খাই সেসব খাবার সরলীকৃত হওয়ার পরে সেগুলো আমাদের দেহের বিভিন্ন
কোষে পৌঁছে দেওয়া হয়। তো, আমাদের খাদ্য উপাদান গুলোর মাঝে গুরুত্বপূর্ণ একটি
উপাদান হল কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা। শর্করা আমরা সাধারণত ভাত, রুটি, আলু, এগুলোর
মাধ্যমে পেয়ে থাকে। যখন আমরা এই জাতীয় খাবার গুলো খাই তখন এর ভেতরে থাকা
কার্বোহাইডেট আমাদের দেহের বা কোষ গুলোর শোষণ উপযোগী হওয়ার জন্য সহজে বললে
চিনিতে রুপান্তরিত হয়।
আল্লাহর সৃষ্টি খুব অপরূপ। আমাদের শরীরের যে কোন কিছুরই একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে। ওই সীমার কম বা বেশি হলে শরীরে তখন নানাবিধ সমস্যা দেখা যায়। আমাদের শরীরে রক্তের মধ্যে sugar এর ও একটা মাত্রা আছে। এই sugar আমাদের শরীরের বিভিন্ন কাজ করে থাকে।
তবে সব থেকে জরুরী হল,চিনি বা sugar আমাদের মস্তিষ্ককে তৎক্ষণাৎ সক্রিয় করে, মস্তিষ্ককে তার কাজ করতে শক্তি যোগায়। আমাদের রক্তে গুকোজ পরিমাণ হল-৬০ থেকে ১০০ সম/ফক অর্থাৎ প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৬০ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম গুকোজ বিদ্যমান। যখন আমরা বেশি বেশি ভাত-রুটি বা শর্করা জাতীয় খাদ্য খায় তখন আমাদের এই গুকোজ পরিমাণ বেড়ে যায় রক্তে। খাওয়ার পর পর ও বাড়ে এটা। আবার যখন দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকি তখন গুকোজ পরিমাণ কমে যায়।
যখন আমাদের শরীরে গুকোজ পরিমাণ বেড়ে যায় তখন শরীরের সকল কার্যক্রম ঠিক রাখতে নির্দিষ্ট সীমা বা রেঞ্জের মধ্যে আনার প্রয়োজন পড়ে। আর এই কাজটি করে থাকে আমাদের অগ্ন্যাশয় গ্রন্থি। আমাদের উদার অঞ্চলে অবস্থিত ছোট্ট পাতার মত একটি অঙ্গ এটি। এই অঙ্গে আলফা ও বিটা নামের বেশ কিছু কোষ থাকে। বিটা কোষ থেকে নিঃসৃত হয় ইনসুলিন নামক বিশেষ এক ধরনের পদার্থ।
এই ইনসুলিন রক্তস্রোতে মিশে গিয়ে বেড়ে যাওয়া গুকোজ এর পরিমাণ কমিয়ে এনে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আনে। মূলত ইনসুলিন নামক এই হরমোনের প্রভাবে বাড়তি গুকোজ গুলো রক্ত থেকে কোষে প্রবেশ করে বলেই রক্তে গুকোজ পরিমাণ কমে যায়। আবার কখনো যদি ইনসুলিনের পরিমাণ বেড়ে যায় তবে আলফা কোষ থেকে গুকাগণ নামের এক হরমোন এসে ইনসুলিনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়, তখন রক্তে আবারো ইনসুলিন বেড়ে গিয়ে সঠিক সীমানায় চলে আসে।
যখন আমাদের শরীরে এই ইনসুলিন ঠিকঠাক কাজ করে না বা উৎপন্নই হয় না তখন সেই অবস্থাকেই আমরা ডায়াবেটিস বলি। না, একটু ভুল হল। সেই অবস্থাকে না, বরং ইনসুলিনের অভাবে বা কার্যহীনতায় আমাদের শরীরে বেশ কিছু জটিলতা বা কমপ্লিকেশনস দেখা দেয় সেটাকে বলা হয় ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র।
ডায়াবেটিস দুই প্রকার
এই ডায়াবেটিস আবার দুই প্রকার।
১। টাইপ ১ বা ইনসুলিন নির্ভর ডায়াবেটিস
২।টাইপ ২ বা ইনসুলিন অনির্ভর ডায়াবেটিস
টাইপ ১ এর ডায়াবেটিস হওয়ার কারণ হলো কোনো না কোনোভাবে অগ্নাশয়ের বিটা কোষ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে পর্যাপ্ত পরিমান ইনসুলিন উৎপন্ন না হওয়া। এটি সাধারণত অল্প বয়সে ধরা পড়ে। এবং এর একমাত্র প্রতিকার হল বাহ্যিকভাবে তৈরি ইনসুলিন ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানো।
অন্যদিকে টাইপ ২ এর ডায়াবেটিস টা আমাদের চারপাশে আমরা বেশি দেখে থাকি। বার্ধক্যে উপনীত হলে,অতিরিক্ত ওজনের কারণে, বংশীয় কারণে মানুষের এ ধরনের ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে অগ্নাশয়ের বিটা কোষ নষ্ট হয় না। বরং এটি ঠিকঠাক ভাবেই ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে। সমস্যাটা তৈরি হয় কোষ কর্তৃক ইনসুলিন কে ব্যবহার করতে না পারার কারণে। তাই এই টাইপের ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে ইনসুলিন প্রবেশ করিয়াও কোন লাভ হয়না। এক্ষেত্রে সমাধান হলো হাটাহাটি করা, ওজন কমানোর চেষ্টা করা, চিনি জাতীয় খাবার কম খাওয়া এবং ডাক্তারের পরামর্শক্রমে ওষুধ খেতে হবে।
ডায়াবেটিস এর লক্ষণ কি কি
দুই প্রকার ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে বেশ কিছু লক্ষণ আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো
১।ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া।
২।বেশি বেশি ঘামতে থাকা।
৩।ক্ষত না শুকানো
৪। বেশি বেশি ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় লাগা।
৫। আস্তে আস্তে মানব দেহের ওজন কমতে থাকা।
৬। চোখে ঝাপসা দেখা ডায়াবেটিস রোগীর একটু অন্যতম লক্ষণ।
ডায়াবেটিস রোগীর ব্যায়াম
ডায়াবেটিস যাদের আছে তারা যদি নিয়মিত ব্যায়াম করে তাহলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু কিভাবে করব কোন ব্যায়ামগুলো করবো আমরা অনেকেই জানিনা তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক একজন ডায়াবেটিস রোগী তার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কি কি ব্যায়াম করা জরুরী।
১। প্রতিদিন সকালে ৩০ মিনিট সময় ধরে হাঁটত হবে।
২। সাইকেল চালানো।
৩। সাঁতার কাটা।
৪। ক্রিকেট খেলা, ফুটবল খেলা, টেবিল টেনিস খেলা, বিভিন্ন ধরনের মার্শাল আর্ট প্র্যাকটিস করা ইত্যাদি।
৫। নিয়মিত ইয়োগা অনুশীলন করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।
৬। প্রতিদিন সঠিক নিয়মে পুস আপ দেওয়া।
ডায়াবেটিস মাপা মেশিনের দাম
ডায়াবেটিস মাপা মেশিন বিভিন্ন দামের আছে। আপনি পছন্দ করে সামর্থ্য অনুযায়ী ডায়াবেটিস মাপা মেশিন ক্রয় করতে পারবেন। সাধারণত ৭৫০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০০০ টাকা বা তার বেশি দামের মেশিন পাওয়া যায়।
ডায়াবেটিস হলে কি কি খাবার খাওয়া উচিত
নাম শুনলেই ভীতি সৃষ্টি হওয়া রোগ ডায়াবেটিস তবে গবেষণা বলছে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখলে ঠেকানো সম্ভব এই রোগকে। রোগটি নিয়ন্ত্রণে খাবারের তালিকায় কার্বোহাইড্রেট এর পরিমাণ কম রেখে মৌসুমী ফল ও সবজি রাখার পরামর্শ পুষ্টিবিদদের। শরীর সুস্থ রাখতে প্রয়োজন পরিমিত খাদ্য গ্রহণ। আর ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সংযমী খাদ্যাভ্যাস প্রধান চিকিৎসা।আর দিনের আহার থেকে শুরু করে রাতে খাবারে ক্যালরির মাত্রা হবে সীমিত পরিমাণে।
সাথে নিয়ম করে খেতে হবে আমিষ ও চর্বি জাতীয় খাবার। গবেষণা বলছে ডায়াবেটিস রোগীদের খাবারের রুটিনে কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার কম হলেই ভালো, মিষ্টি জাতীয় ফল এড়িয়ে রাখতে হবে ফাইবার যুক্ত সবজি। মৌসুমী বিভিন্ন সবজির মিশ্রণের খাবারের পাশাপাশি আপেল, পেয়ারার মতো ফল রাখতে হবে খাবারের পাতে। ডায়াবেটিসকে ভয় না পেয়ে খাবারে বৈচিত্র আনার পরামর্শ পুষ্টিবিদদের। ডায়াবেটিসের রোগীর জন্য বাদাম খাওয়া উচিত। কেননা বাদামের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার ও মেগা থ্রি রয়েছে যেটা আমাদের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ রাখতে সহায়তা করে।
ডায়াবেটিস থেকে কি সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া সম্ভব
অনেকেই দাবি করেন যে ডায়াবেটিস মুক্ত হওয়া সম্ভব এবং ডায়াবেটিস থেকে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। এ নিয়ে প্রচারণা ও চালাচ্ছেন এবং রোগীরা সেখানে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন রোগীরা চেষ্টা করছেন ডায়াবেটিস রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। আসলেই কি ডায়াবেটিস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া সম্ভব? এ নিয়ে একটু আলোচনার প্রয়োজন আছে এ নিয়ে আপনাদের ধারণা থাকা দরকার।
রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে আসেন তখন চিকিৎসক বলেন ডায়াবেটিস আপনার সারা জীবনের রোগ আপনি ব্যায়াম করবেন, নিয়মিত ওষুধ খাবেন, খাবার নিমন্ত্রণ করবেন, ওষুধ খাওয়া কখনো বাদ দিবেন না নিয়মিত চেকআপ করবেন। আপনার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে অন্যথায় নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে আপনার হার্ট অ্যাটাক, কিডনি, লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আপনাকে সারাজীবনই ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। আসলে যাদের ডায়াবেটিস হয় তাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিন্তু এই তথ্যটি সত্য। হয়তো তাদের সারা জীবন এই ডায়াবেটিস থাকবে এবং তাদেরকে সারা জীবন ওষুধ খেয়ে যেতে হবে ।ওষুধ বাদ দেয়া যাবে না। এখানে লক্ষ্য করবেন, ডায়াবেটিস রোগীদের চিকিৎসা কিন্তু তিনটা। এগুলো হলো ব্যায়াম, খাবার দাবার নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত ওষুধ সেবন। এখন দেখা গেল কি যাদের ডায়াবেটিস হয় শুধুমাত্র একটি কারণে সবার ডায়াবেটিস হয় না,একেক জনার একেক কারণে হয়ে থাকে।
কারো অগ্নাশয়ের বিটা কোষ যেখান থেকে ইনসুলিন তৈরি হয় সেটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে বা নষ্ট হয়ে কোন কারণে ইনসুলিন ডিফিসিয়েন্সি হয়ে তারপরে ডায়াবেটিস হয়। তাদের ডায়াবেটিস সারা জীবন থাকবে। অন্যথায় বংশগত কারণে যদি আপনি ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন তাহলে আপনার ডায়াবেটিস রোগ সারাজীবন থাকবে কখনো কোনদিন ভালো হবে।
আর আপনার ওজন বেশি হওয়ার কারণে যদি আপনার ডায়াবেটিস রোগ হয় তাহলে আপনি ওজন কমিয়ে এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারবেন। শুধুমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আপনাকে জীবন যাপন করতে হবে। সেই সাথে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে, ব্যায়াম করতে হবে ইত্যাদি।
শেষ কথা
ডায়াবেটিসকে জাতীয় রোগ বললে ভুল হবে না।কারণ এমন অসংখ্য মানুষ আমাদের সমাজে বাস করে তারা ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত। আপনার ডায়াবেটিস রোগ থাকলে আপনি অন্যান্য রোগে সহজে আক্রান্ত হয়ে যাবেন।তাই ডায়াবেটিস রোগ যেন আমাদের না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে আজকাল প্রায় মানুষ ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তারা দীর্ঘদিন ওষুধ সেবনের মাধ্যমে ও ব্যায়াম করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ রেখেছে।
আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো আপনি যদি ডায়াবেটিস রোগ আক্রান্ত হতে না চান তাহলে প্রতিদিন শত ব্যস্ততার মাঝেও এক ঘন্টা সময় বের করে নেই এক ঘন্টা সময় ব্যায়াম করুন, নিয়মিত খাবার খান, সঠিক সময়ে ঘুমিয়ে যান।তাহলে সুস্থ থাকবেন অসুস্থ মানুষের সংখ্যা কমে আসবে। এ ধরনের আর্টিকেল নিয়মিত পড়তে চাইলে আমার ওয়েবসাইটটি ভিজিট করবেন।আর এই আর্টিকেলটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে কমেন্ট করে জানাবেন।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url